নাম বদলে বাধা কর্মকর্তারাই
সরোয়ার আলম প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:২৬ এএম
প্রতিটি বিমানে লেখার পেছনে অর্থাৎ নাম খোদাইয়ের পেছনে খরচ হয়েছে ১০ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় ১২ লাখ ২০ হাজারের মতো)। ১৬টি উড়োজাহাজে খরচ হয়েছে ২ কোটি টাকার বেশি। বেশিরভাগ টাকাই নয়ছয় হয়েছে বলে বিমানের একটি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিশে^র কোনো দেশের এয়ারলাইনস নিজ দেশের ও প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা ছাড়া অন্য কোনো ধরনের নাম লিখে না। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। কোনো নিয়মই মানেনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে গেলে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শেখ হাসিনাসহ তার পরিবারের সদস্যদের নামে রাখা প্রতিষ্ঠানের ও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম পরিবর্তন করা হলেও রাষ্ট্রের টাকা অপচয় করে রাখা বিমানের নামগুলোর এখনো পরিবর্তন করা হয়নি। মাস ছয়েক আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিমানের নামগুলোর পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলে বিমানের কর্মকর্তারাই তাতে বাধা সৃষ্টি করেন এবং এখনো করছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্র্ণ প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের বদল হলেও বিমানে বদল হয়নি বললেই চলে। সংস্থাটিতে এখনো ফ্যাসিস্ট কর্মকর্তারা বহাল আছেন। অভিযোগ উঠেছে, বিমানে তারা ঘাপটি মেরে আছেন। একের পর এক বিমানের ফ্লাইটে ত্রুটি ধরা পড়ছে মূলত তাদের খামখেয়ালির কারণে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি করেছে বিমান।
আওয়ামী লীগ মতাদর্শীরাই নিয়ন্ত্রক : আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা বিমানকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন তারাই এখন কৌশলে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে নাম প্রকাশ না করে সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশের এয়ারলাইনসেই অন্য কোনো জাতের বা ব্যক্তির নাম থাকে না।
উড়োজাহাজগুলো যখন বাংলাদেশে আসে তখন বিমানের কিছু কর্মকর্তা অতি উৎসাহী ছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বিমানের উপরাংশে নাম লেখার প্রস্তাব করেন তখন আমরা তার বিরোধিতা করেছিলাম। গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেও চিঠি দিয়েছিলাম। আমাদের কথায় ওই কর্মকর্তারা পাত্তা দেননি।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনার দেওয়া নামগুলো বাদ দিতে বললেও বিমানের কিছু কর্মকর্তা এর বিরোধিতা করেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কেও জানানো হয়। কিন্তু ওইসব কর্মকর্তার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। রাষ্ট্রের টাকা নয়ছয় করার জন্য নামগুলো বিমানে যুক্ত করা হয়েছে।’
বিমানসূত্র জানায়, ২০১১ সালের ২৩ অক্টোবর ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজ আনা হয় বাংলাদেশে। এটির নাম রাখা হয় ‘পালকি’। ওই বছরের ২৪ নভেম্বর একই মডেলের উড়োজাহাজ আনা হলে নাম রাখা হয় ‘অরুণা আলো’। ২০১৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারিতে আনা ৭৭৭-৩০০ ইআর মডেলের উহোজাহাজ। এর নাম রাখা হয় ‘আকাশ প্রদীপ’। ওই বছরের ২৩ মার্চ একই মডেলের উড়োজাহাজ আনা হলে নাম রাখা হয় ‘রাঙ্গা প্রভাত’। ২০১৫ সালের ২৭ নভেম্বর আনা হয় ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহজ; নাম রাখা হয় ‘মেঘদূত’। ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট বাংলাদেশে আসে ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার; নাম রাখা হয় ‘আকাশ বীণা’। একই বছরের ১০ ডিসেম্বর একই মডেলের ড্রিমলাইনার আনা হলে নাম রাখা হয় ‘হংসবাংলা’। ২০১৯ সালের ২৫ জুলাই একই মডেলের ড্রিমলাইনার আসে বাংলাদেশে; নাম রাখা হয় ‘গাংচিল’। ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর একই মডেলের ড্রিমলাইনার আসে; নাম রাখা হয় ‘রাজহংস’। ২০১৯ সালের ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশে আসে ৭৮৭-৯ মডেলের ড্রিমলাইনার; নাম রাখা হয় ‘সোনার তরী’। ২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর একই মডেলের ড্রিমলাইনার আনা হয়; নাম রাখা হয় ‘অচিন পাখি’। ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর আনা হয় ড্যাশ-৮ কিউ ৪০০-এস২-একেডি মডেলের উড়োজাহাজ; নাম রাখা হয় ‘ধ্রুবতারা’। একই বছর একই মডেলের ড্যাশ আনা হলে নাম রাখা হয় ‘হংস মিথুন’। ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে আনা হয় ড্যাশ বিমান; নাম রাখা হয় ‘আকাশতরী’। ২০২১ সালের ৫ মার্চ বাংলাদেশে আসে একই মডেলের ড্যাশ; নাম রাখা হয় ‘শ্বেত বলাকা’।
১ লাখ ৬০ হাজার ডলার অপচয় : একেকটি উড়োজাহাজের চালকের বসার ওপরের অংশে খোদাই করা লেখাগুলোর পেছনে খরচ ১০ হাজার মার্কিন ডলার। সবমিলিয়ে ১৬টি উড়োজাহাজে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দুই কোটি। এ টাকা খরচের পেছনেও রয়েছে কিছু কর্মকর্তার হাত। তারা কম খরচ দেখিয়ে বেশি ব্যয় দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই কর্মকর্তাদের সঙ্গে তৎকালীন গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নাম লেখার পেছনেও ঘাপলা আছে।’
নাম পছন্দ করে দেন শেখ হাসিনা : বিমানের সবগুলো উড়োজাহাজের নাম সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পছন্দ করে দিয়েছেন। তার দেওয়া নামগুলোর বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারেনি। বিমানে উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার পর সেগুলোর নামকরণ নিয়ে বরাবরই আগ্রহ দেখা যায়। ‘আকাশবীণা’, ‘রাজহংস’, ‘গাংচিলের’ মতো নামগুলো শেখ হাসিনা চূড়ান্ত করেছেন। তিনি বিমান কর্তাদের বলেছেন, নামগুলো সাধারণত বাংলাদেশের সংস্কৃতি, প্রকৃতি এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা হয়েছে। বিমানের ওই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উড়োজাহাজগুলো আসার পর শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রায় প্রতিটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। তিনি যা বলতেন তাতেই সায় দিয়ে এসেছি। নামগুলো রেখে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় করা হয়েছে।’
বোয়িংগুলোর দাম কেমন : ২০০৮ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ওই চুক্তির আওতায় ছিল ৪টি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, ৪টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এবং ২টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০। পরে আরও কিছু উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হয়েছে। প্রতিটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজের গড় দাম ছিল ১৮২.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। উড়োজাহাজগুলো দীর্ঘ রুটের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে এবং আসন সংখ্যা ৪১৯। বোয়িং ৭৮৭-৮, ২০০৮ সালের চুক্তি অনুযায়ী ১৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯ সালে ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার কেনা হয়েছিল প্রতিটি প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়ে।
আন্তর্জাতিক রুট বাড়ানোর পরিকল্পনা : বিমানসূত্র জানায়, আরও আন্তর্জাতিক রুট বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বিমান। নারিতা ফ্লাইটটি আবারও চালু করা যায় কি না তা নিয়ে বিমান কর্তারা আলোচনা করছেন। রোমের রুট চালু হলেও জনবল সংকটসহ বেশ কিছু সমস্যায় আছে সংস্থাটি। নিউ ইয়র্কের ফ্লাইটও চালু করতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার এ রুটটি চালু করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু সফল হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিমানকর্তারা আশা করেছিলেন দ্রুত সময়ে রুটটি চালু হবে। কিন্তু না হওয়ায় হতাশ তারা।
0 মন্তব্যসমূহ